News
ফিফা বসের ‘ঠান্ডা থাকুন’ মন্তব্যে বিশ্বজুড়ে উষ্ণ বিতর্ক: বিশ্বকাপ ভিসার জটিলতা আর টিকিটের টানাপোড়েন
ফিফা বসের ‘ঠান্ডা থাকুন’ মন্তব্যে বিশ্বজুড়ে উষ্ণ বিতর্ক: বিশ্বকাপ ভিসার জটিলতা আর টিকিটের টানাপোড়েন
মেক্সিকো সিটি থেকে ভেসে আসা একটা কথা এখন ফুটবল দুনিয়ায় আলোচনার কেন্দ্রে। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো কিঞ্চিৎ তাচ্ছিল্যের সুরেই যেন বললেন, বিশ্বকাপ উপলক্ষে ভিসা জটিলতা নিয়ে নাকি ‘একটু ঠাণ্ডা থাকতে’ হবে! হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন, “চিল অ্যান্ড রিল্যাক্স”। বিশ্ব ফুটবলের এই সর্বোচ্চ কর্তা যখন মেক্সিকো সিটিতে তাঁর প্রাক-বিশ্বকাপ সংবাদ সম্মেলনে এই কথাগুলো বলছিলেন, তখন তাঁর গলায় একধরণের আত্মবিশ্বাস ছিল, নাকি নিছকই একরাশ অসহায়তা? বোঝা কঠিন। তবে একটা কথা পরিষ্কার, বিশ্ব ফুটবলের বস হয়েও তিনি যেন বুঝিয়ে দিলেন, কিছু কিছু বিষয়ে তাদের হাত-পা বাঁধা।
বুধবার মেক্সিকো সিটিতে ইনফান্তিনো জোর দিয়েই বললেন, “বিশ্বাস করুন, বা না করুন, আমরা সব সময় সমাধানের চেষ্টা করি। সব সময়। কিন্তু আমাদের এটা মেনে নিতেই হবে যে আমরা বিশ্বের রাজা নই, যারা সরকার বা পুলিশ বাহিনীর ওপর খবরদারি চালাতে পারি।” তাঁর এই মন্তব্য বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষত যখন ইরান দলের খেলোয়াড়দের মার্কিন ভিসা নিয়ে এক অদ্ভুত টানাপোড়েন চলছিল, আর সোমালিয়ার এক রেফারিকে কিনা ‘সন্ত্রাসী যোগসূত্র’র অজুহাতে আমেরিকায় ঢুকতে দেওয়া হয়নি!
সোমালি রেফারির কপালে জুটলো ‘সন্ত্রাসী’ তকমা: ইনফান্তিনোর ‘অসহায়’ মন্তব্য
মনে আছে, সোমালিয়ার রেফারি ওমর আর্টান-এর কথা? ফিফা তাঁকে বিশ্বকাপের জন্য চূড়ান্ত তালিকায় রেখেছিল। স্বপ্ন দেখছিলেন, প্রথম সোমালি রেফারি হিসেবে বিশ্বকাপে বাঁশি বাজাবেন। ইস্তাম্বুল থেকে মায়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার পর তাঁর কপালে জুটলো নির্মম সত্য – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাঁকে দেশে ঢুকতে দিল না। কারণ? মার্কিন এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আর্টানের নাকি “সন্দেহভাজন সন্ত্রাসী সংগঠনের সদস্যদের সাথে যোগসূত্র” ছিল। ব্যাপারটা নিয়ে ফুটবল মহলে রীতিমতো গুঞ্জন।
ইনফান্তিনো এই ঘটনা নিয়ে খানিকটা আক্ষেপ প্রকাশ করেই বললেন, “ওমরের সাথে যা হলো, সেটা দুর্ভাগ্যজনক। কিন্তু আবারও বলছি, আমরা সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। আমরা চেষ্টা করি, আলোচনা করি, দেখি কী করা যায়। হয়তো কখনও কখনও একটু ঠাণ্ডা থাকা, শান্ত থাকা ভালো।”
শুনতে কেমন যেন লাগে, তাই না? বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল সংস্থার প্রধান বলছেন, “চিল, রিল্যাক্স।” তার মানে কি, ফুটবলের স্বার্থে এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকেও হালকাভাবে দেখা উচিত? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক গভীর কূটনৈতিক জটিলতা, যেখানে ফিফা-ও আসলে সরকারের সামনে অসহায়? আমার মনে হয়, দ্বিতীয়টাই বেশি সত্যি।
ইনফান্তিনো আরও যোগ করলেন, “কখনও কখনও সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করলে সমাধানের বদলে উল্টো ফল হয়। আমরা সব সময় সমাধান খুঁজতে চেষ্টা করি। সব সময়। কিন্তু আমাদের সম্মান জানাতে হবে যে আমরা বিশ্বের রাজা নই, যারা সরকার বা পুলিশ বাহিনীর ওপর খবরদারি চালাতে পারি।” তার এই কথাগুলো হয়তো ফিফার ক্ষমতার সীমাবদ্ধতারই ইঙ্গিত দেয়। একটা বিশ্বযুদ্ধ বা বড়সোর রাজনৈতিক বিতর্কের মাঝখানে দাঁড়িয়ে যখন ফুটবলের আয়োজন করতে হয়, তখন এমন কিছু সমস্যা আসেই, যা ফিফার পক্ষে একা সামলানো সম্ভব নয়।
“চিল” মানে “কিছু না করা” নয়, ইরান ভিসার উদাহরণ
পরে যখন ইনফান্তিনোকে তাঁর ‘ঠাণ্ডা থাকুন’ মন্তব্যটি পরিষ্কার করার জন্য চাপ দেওয়া হলো, তখন তিনি একটু নড়েচড়ে বসলেন। বললেন, “আমি ‘ঠাণ্ডা থাকুন’ বলতে এটা বোঝাইনি যে কিছু না করে বসে থাকুন। আমি বলতে চেয়েছি, আমাদের ওপর ভরসা রাখুন যে আমরা আড়ালে কাজ করছি, বোঝার চেষ্টা করছি।” তিনি বোঝাতে চাইলেন, কিছু তথ্য তাদের জানানো হয়, কিছু হয় না। তারা সবসময় ইতিবাচক দিকটা দেখে সমাধান খুঁজতে চেষ্টা করেন।
আর এর প্রমাণ হিসেবে তিনি ইরান ফুটবল দলের কথা তুলে ধরলেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক এখন যে তলানিতে এসে ঠেকেছে, তা আমরা সবাই জানি। এই পরিস্থিতিতে ইরান দলকে আমেরিকায় খেলার জন্য ভিসা পাইয়ে দেওয়াটা তো চাট্টিখানি কথা নয়! ইনফান্তিনো গর্বের সঙ্গে বললেন, “ইরানকে আমেরিকায় খেলতে আনাটা সফল হয়েছে। কে পারতো এটা করতে জানি না… আমরা চাঁদে বাস করি না, আমরা পৃথিবীতে বাস করি এবং আমরা আমাদের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করি।”
আসলে, ইরান দলের ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতা এতটাই ছিল যে তাদের অনুশীলন শিবির মেক্সিকোর তিহুয়ানায় স্থানান্তরিত করতে হয়েছিল। কিন্তু তারপরও তারা ভিসা পেয়েছেন। ইনফান্তিনো এই সাফল্যকে ফিফার পর্দার আড়ালে কাজ করার ফল হিসেবেই তুলে ধরলেন। এই সব জটিলতা সত্ত্বেও, ইনফান্তিনো কিন্তু ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সহ-আয়োজক হিসেবে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তে কোনো আফসোস করছেন না। তার মতে, এমন বিশাল এক ইভেন্ট আয়োজন করতে গেলে ছোটখাটো সমস্যা থাকবেই।
টিকিটের দামে নাকি “রিল্যাক্সড” ফিফা!
ভিসা জটিলতার পাশাপাশি আরও একটা বিষয় নিয়ে ফিফা এখন সমালোচিত – বিশ্বকাপের টিকিটের দাম। ক্যালিফোর্নিয়া, নিউ জার্সি, নিউ ইয়র্ক এবং টেক্সাসের অ্যাটর্নি জেনারেলরা এখন টিকিটের দাম নিয়ে তদন্ত করছেন। কিন্তু এই নিয়েও ফিফা সভাপতি বেশ ‘রিল্যাক্সড’।
ইনফান্তিনো জানালেন, “আমাদের এই বিষয়ে খুব ‘রিল্যাক্সড’ থাকা দরকার, কারণ ৭ মিলিয়ন টিকিট বিক্রি শুরু করার আগে আমরা সেরা আইনজীবী বা বিশেষজ্ঞদের সাথে পরীক্ষা করে নিয়েছিলাম যে আমরা কী করব।”
ক্যালিফোর্নিয়ায় লস অ্যাঞ্জেলেস এবং সান ফ্রান্সিসকোর খেলার জন্য প্রায় ৮০০,০০০ টিকিট বিক্রি হয়েছিল। এই ৮০০,০০০ টিকিটের মধ্যে মাত্র তিনজন গ্রাহক অভিযোগ করেছিলেন। পরে আরও একজন যোগ দেন। ইনফান্তিনো দাবি করলেন, “তদন্ত শুরু হওয়ার আগেই এই মামলাগুলো সমাধান করা হয়েছিল। আমরা যেকোনো তদন্তকে স্বাগত জানাই। আমরা সবকিছু উপস্থাপন করব এবং আমাদের বক্তব্য দেব। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমরা যে প্রতিটি ডলার তৈরি করি, তা ফুটবলেই ফিরে যায়।”
কিন্তু সত্যিই কি তাই? ফিফা সাধারণ টিকিটের দাম ধার্য করেছে ১৪০ ডলার, আর ১৯ জুলাই নিউ জার্সিতে ফাইনালের কিছু ভিআইপি সিটের দাম ছিল ৮,৬৮০ ডলার পর্যন্ত! এই বিশাল দাম নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়ে ফিফা পরে বিভিন্ন জাতীয় ফেডারেশনকে সমর্থকের জন্য ৬০ ডলারের টিকিটও ছেড়েছে।
ইনফান্তিনো দাবি করেন, টুর্নামেন্টের গড় টিকিটের দাম ৫০০ ডলারের নিচে ছিল, যা অন্যান্য মার্কিন ক্রীড়া ইভেন্টের প্লে-অফের টিকিটের সাথে তুলনীয়। তার এই দাবি অবশ্য তালিকা মূল্যের জন্য সঠিক বলে মনে হয় না, তবে পুনর্বিক্রয় মূল্যের ক্ষেত্রে হয়তো কিছুটা সত্যি। কিন্তু সাধারণ একজন সমর্থকের জন্য ৫০০ ডলারের নিচে টিকিট পাওয়া কি আদৌ সম্ভব ছিল? আমার তো মনে হয়, ইনফান্তিনো এখানে কিছুটা কৌশল খাটাচ্ছেন। উচ্চ মূল্যের টিকিট আর কম মূল্যের টিকিটের গড় করলে একটা মাঝামাঝি সংখ্যা তো আসবেই।
তবে একটা বিষয় স্পষ্ট, ইনফান্তিনো এই সব অভিযোগ বা সমালোচনা নিয়ে খুব একটা বিচলিত নন। তাঁর কাছে মনে হচ্ছে, ফিফা যা করেছে, সেটা সঠিক নিয়ম মেনেই করেছে, আর এর পেছনে তাদের যথেষ্ট আইনি যুক্তিও আছে। কানাডা ও মেক্সিকোর সাথে যৌথভাবে আয়োজিত এই বিশ্বকাপ শুরু হচ্ছে বৃহস্পতিবার, মেক্সিকো সিটি-র এস্তাদিও আজটেকা স্টেডিয়ামে মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচের মাধ্যমে।
শেষ বেলায় এসে মনে হয়, ইনফান্তিনোর এই “চিল অ্যান্ড রিল্যাক্স” মন্তব্যটা আসলে ফিফার এক ধরণের আত্মরক্ষার কৌশল। যখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইভেন্ট আয়োজন করতে গিয়ে বিভিন্ন দেশের সরকারের সাথে বোঝাপড়া করতে হয়, তখন ফিফার হাত-পা খানিকটা বাঁধাই থাকে। তারা হয়তো চাইলেও সব কিছু নিজেদের মতো করে করাতে পারে না। কিন্তু এই মন্তব্যের আড়ালে কি সত্যিই সব সমস্যা মিটিয়ে ফেলার একটা আন্তরিক প্রচেষ্টা লুকানো আছে, নাকি এটা আসলে নিজেদের ব্যর্থতাকে ঢেকে রাখার একটা সহজ উপায়? সময় বলবে।
গুগলে আমাদের আপডেট পেতে:
Add amir info bangla as a Preferred Source