News
এআইয়ের সস্তা দর: সোনার ডিম নাকি ডটকম বুদবুদের ছায়া? বাজারের এক বিশেষজ্ঞের কড়া হুঁশিয়ারি!
এআইয়ের সস্তা দর: সোনার ডিম নাকি ডটকম বুদবুদের ছায়া? বাজারের এক বিশেষজ্ঞের কড়া হুঁশিয়ারি!
বাজারে এখন যেন এক অদ্ভুত খেলা চলছে! একদিকে ঝলমলে টেক স্টকগুলো, বিশেষ করে এআই ঘিরে তৈরি হওয়া কোম্পানিগুলোর শেয়ার, যেন উড়ছে আকাশে। তাদের দামও এখন বেশ হাতের নাগালে, যাকে অনেক বিনিয়োগকারী ‘সোনার ডিম’ পাড়ার সুযোগ হিসেবে দেখছেন। তাদের চোখে, এমন সস্তা দরে ভালো শেয়ার কেনার সুযোগ হাতছাড়া করা মানেই বোকামি। কিন্তু এই যে ‘সস্তা’ দেখছেন, ঠিক এই জায়গাতেই লুকিয়ে আছে আসল বিপদ। অন্তত বাজারের এক অভিজ্ঞ গবেষক তেমনই বলছেন।
সেভেন্স রিপোর্ট রিসার্চের প্রতিষ্ঠাতা টম এস্যায় সম্প্রতি তার এক নোটে একটা বিস্ফোরক বার্তা দিয়েছেন। তিনি সাফ জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে এআই স্টকগুলোর কম মূল্য আসলে একটা ভয়ংকর সংকেত। তাঁর মতে, এর মানে হলো বিনিয়োগকারীরা ভেতরে ভেতরে ভয় পাচ্ছেন যে, এআইয়ের জন্য ডেটা সেন্টার তৈরির যে বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে, সেটার গতি হয়তো যেকোনো মুহূর্তে থমকে যেতে পারে।
ভাবুন তো, কতটা উল্টো কথা! সাধারণত আমরা কী দেখি? যে কোম্পানিগুলোর ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি বা আয় অনেক বেশি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, বিনিয়োগকারীরা তাদের শেয়ারের জন্য বেশি দাম দিতেও রাজি থাকে। এটাই তো বাজারের চিরন্তন নিয়ম, তাই না? একটা ‘গ্রোথ স্টক’ মানেই তো তাকে নিয়ে আকাশছোঁয়া প্রত্যাশা। কিন্তু যখন এআইয়ের মতো একটা সেক্টরের, যার ভবিষ্যৎ নিয়ে এত মাতামাতি, সেই স্টকগুলোর দাম এতটা কম থাকে, তখন আসল প্রশ্নটা আসে – কেন? এস্যায় বলছেন, এর একটাই মানে – বিনিয়োগকারীরা এই ‘সোথামালি’ ভবিষ্যতের ওপর একেবারেই আস্থা রাখতে পারছেন না। তাদের মনে হচ্ছে, এআইয়ের এই যে বিশাল সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে, হয়তো বাস্তবে তা কোনোদিনই পূর্ণ হবে না। ফ্র্যাঙ্কলি, এটা বাজারের একটা মারাত্মক মনস্তাত্ত্বিক খেলা।
এস্যায় ব্যাপারটা বোঝাতে চারটে উদাহরণের দিকে আঙুল তুলেছেন। কিছু বিখ্যাত এআই সংশ্লিষ্ট কোম্পানির গত এক বছরের পারফরম্যান্স আর তাদের ফরোয়ার্ড পিই মাল্টিপল তুলে ধরেছেন। ব্যাপারটা শুনলে আপনিও হয়তো একটু থমকে যাবেন।
- Nvidia: গত ১২ মাসে শেয়ারের দাম বেড়েছে ৪৪ শতাংশ। আর তার ফরোয়ার্ড পিই অনুপাত? ২১ গুণ।
- Micron Technology: এদের ক্ষেত্রে তো আরও অবাক করা ব্যাপার! গত ১২ মাসে শেয়ারের দাম বেড়েছে অবিশ্বাস্য ৭৭০ শতাংশ। অথচ, ফরোয়ার্ড পিই মাত্র ১০ গুণ! ভাবুন তো, এত দাম বাড়ার পরও পিই এত কম? এটা কি স্বাভাবিক?
- Broadcom: গত ১২ মাসে শেয়ারের দাম বেড়েছে ৫১ শতাংশ। ফরোয়ার্ড পিই ২৪ গুণ।
- SanDisk: এ তো রীতিমতো চোখে পড়ার মতো! গত ১২ মাসে শেয়ারের দাম বেড়েছে ৪,৪৯০ শতাংশ। আর তার ফরোয়ার্ড পিই? মাত্র ১৪ গুণ!
তুলনার জন্য জেনে রাখা ভালো, এই মুহূর্তে S&P 500 এর ফরোয়ার্ড পিই অনুপাত প্রায় ২১.৫। এখন মাইক্রন আর স্যান্ডিস্কের পিইয়ের দিকে আরেকবার তাকান। এত কম পিই, এত অসাধারণ ‘আপসাইড’, অথচ এস্যায় বলছেন এটা ভয়ের কারণ। এটা সত্যিই ভাবার মতো বিষয়।
এস্যায়ের মূল কথাটা হলো, যদি এআইয়ের বাস্তব গ্রহণ আর কার্যকারিতা আমাদের কল্পনার চেয়ে কম হয়, অর্থাৎ যদি কোম্পানিগুলো এআইকে যতটা কার্যকর আর লাভজনক ভাবছে, বাস্তবে সেটা না হয়, তাহলে কী হবে? তাহলে বিনিয়োগকারীরা নিশ্চিতভাবে হাত গুটিয়ে নেবে। আর যখন বিনিয়োগ কমবে, তখন যারা এই বিশাল এআই পরিকাঠামো তৈরির সঙ্গে জড়িত, যেমন চিপ নির্মাতা, ডেটা সেন্টার সরঞ্জাম প্রস্তুতকারক, মেমরি কোম্পানি বা নেটওয়ার্কিং সলিউশন প্রোভাইডার – তাদের বিক্রি হু হু করে কমবে।
আচ্ছা, ব্যাপারটা এভাবে ভাবুন তো: GOOGL (শুধু একটা উদাহরণ হিসেবে ধরছি, মানে গুগল) হঠাৎ করে ঘোষণা করল যে, তারা ১০টা নতুন ডেটা সেন্টার তৈরির পরিকল্পনা বাতিল করছে। কেন? কারণ তাদের মনে হচ্ছে, এই বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগের তুলনায় ভবিষ্যৎ রিটার্ন যথেষ্ট নয়। ফলাফল কী হবে জানেন? এনভিডিয়া (NVDA), মাইক্রন (MU), ব্রডকম (AVGO), স্যান্ডিস্ক (SNDK) এর মতো কোম্পানিগুলোর কাছে আসা বিশাল বিশাল অর্ডারের বুকিং এক নিমেষে বাতিল হয়ে যাবে। কারণটা খুব সোজা – ডেটা সেন্টার না হলে কারোরই তো নতুন চিপ, অত্যাধুনিক নেটওয়ার্কিং সরঞ্জাম, বিপুল মেমরি বা উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন প্রসেসর লাগবে না! এটা একটা ডমিনো এফেক্ট, যেখানে একটা পড়লে বাকিগুলোকেও টেনে নামাবে। এই পুরো এআইয়ের পিরামিডটা দাঁড়িয়ে আছে ডেটা সেন্টারের মতো মজবুত ভিত্তির ওপর। ভিত্তি নড়লে সব শেষ। আমার তো মনে হয়, এই যুক্তিটা বেশ কঠিনভাবে আঘাত করে বাজারের মূল কাঠামোতে।
বিনিয়োগকারীদের এই অস্থিরতার একটা টাটকা উদাহরণ কি চান? এই তো ওরাকলের (Oracle) শেয়ারের দিকে তাকান। ক্লাউড পরিকাঠামো, এআইয়ের জন্য ডেটা সেন্টার তৈরিতে হাজার হাজার কোটি টাকা ঢালছে ওরাকল। কিন্তু জুন মাসের ১ তারিখ থেকে কোম্পানিটার শেয়ারের দাম প্রায় ২৫% কমে গেছে! বাজারে এত টাকা ঢালার পরও যদি শেয়ারের দাম এভাবে পড়ে, তাহলে কি এটা বিনিয়োগকারীদের ভয়ের স্পষ্ট ইঙ্গিত নয়? অবশ্যই।
এস্যায় অবশ্য সরাসরি বলছেন না যে, বাজার এখনই টপে পৌঁছে গেছে আর এবার বড়সড় পতন শুরু হবে। না, তিনি শুধু একটা ঐতিহাসিক তুলনার দিকে ইঙ্গিত করছেন – কুখ্যাত ডটকম বুদবুদ। ২০০০ সালে যে বুদবুদ ফেটেছিল, সেই সময়ের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতিকে তিনি মেলাচ্ছেন, আর বলছেন, “আমি তো মনে করি, এই তুলনাটা একেবারে মোক্ষম।”
তিনি পরিষ্কার বলেছেন, “সত্যি বলতে কি, এই ভয়টা কয়েক মাস ধরেই বাজারে ঘুরছে। এখনো বড়সড় কিছু হয়নি। কিন্তু একটা বিষয় ভুললে চলবে না – এই একই পথ ধরে ডটকম বুদবুদ ফেটেছিল।”
সেটা কীভাবে ফেটেছিল, মনে আছে? ডটকম বুদবুদ! নামটা শুনলেই কি গা ছমছম করে না? নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে ইন্টারনেটকে ঘিরে যে উন্মাদনা ছিল, মানুষ ভেবেছিল এটা সব ব্যবসার চেহারা বদলে দেবে, রাতারাতি হাজার হাজার কোটি টাকা আসবে। “মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার শুরু করেছিল বটে, কিন্তু তার থেকে যে মুনাফা আসবে, সেটা এত দ্রুত বা এত বিশাল হবে বলে সবাই ভেবেছিল, বাস্তবে তা হয়নি,” এস্যায় বুঝিয়ে দিলেন। “আর ফলস্বরূপ? ইন্টারনেট পরিকাঠামো তৈরির কাজ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। হাজার হাজার ইন্টারনেট কোম্পানি ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল। বিনিয়োগকারীরা হতাশ হয়ে সরে গিয়েছিল।” ব্যাপারটা একদম সহজ ছিল। ইন্টারনেটকে ঘিরে যে উন্মাদনা ছিল, সেটা বাস্তবতার কঠিন পাথরে ধাক্কা খেয়েছিল।
আজ এআইয়ের ক্ষেত্রেও একই রকম কিছু হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন এস্যায়। সেদিন ইন্টারনেট, আজ এআই। প্যাটার্নটা কিন্তু একই রকম দেখাচ্ছে। যদি এআইয়ের ক্ষমতা আর ব্যবসার মডেল, বিশেষ করে ডেটা সেন্টারগুলোর রিটার্ন প্রত্যাশা অনুযায়ী না হয়, তাহলে কী হবে? বাজারের এই সস্তা দর তখন আর ‘সস্তা’ থাকবে না, সেটা হবে পতনের শুরু। তখন অনেকেই আফসোস করবে, কিন্তু ততক্ষণে হয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে।
আমার ব্যক্তিগত মত? এই ধরনের ঐতিহাসিক সতর্কবার্তাগুলো প্রায়শই সত্যি হয়। শুধু কান খোলার দরকার। তাই, যারা এখন এআই স্টকগুলোতে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন, তাদের অন্তত একবার হলেও ভাবা উচিত – এটা কি সত্যিই সুযোগ, নাকি একটা বড়সড় ফাঁদ? এস্যায়ের কথায় কান দেওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে, অন্তত আমার তো তাই মনে হয়। বাজারের এই অস্থির সময়ে চোখ-কান খোলা রাখাটাই আসল কথা।
সুত্রপাত: businessinsider.com
গুগলে আমাদের আপডেট পেতে:
Add amir info bangla as a Preferred Source