প্রযুক্তি
উইন্ডোজ পিসি বারবার হ্যাং করছে? জেনে নিন এর ১০টি কার্যকরী সমাধান
উইন্ডোজ পিসি বারবার হ্যাং করছে? জেনে নিন এর ১০টি কার্যকরী সমাধান
পিসিতে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছেন, হঠাৎ মাউসের কার্সর নড়ছে না। কিবোর্ড কাজ করছে না। স্ক্রিনে বড় করে লেখা আসছে “Not Responding”। মেজাজটা তখন কোথায় থাকে বলুন তো? আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কম্পিউটারের হ্যাং হওয়া বা স্লো হয়ে যাওয়াটা এখন নিত্যদিনের সঙ্গী। বিশেষ করে যারা উইন্ডোজ ১০ বা ১১ ব্যবহার করছেন, তাদের জন্য এই সমস্যাটা বেশ পরিচিত।
অনেকেই ভাবেন, পিসি পুরোনো হয়েছে তাই হয়তো এমনটা হচ্ছে। আসলে বিষয়টি সবসময় তা নয়। নতুন কেনা হাই-কনফিগারেশনের ল্যাপটপ বা ডেস্কটপও সঠিক মেইনটেইন্যান্সের অভাবে হ্যাং করতে পারে। আমার অভিজ্ঞতা বলে, ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে সফটওয়্যার অপটিমাইজেশন আর সামান্য কিছু হার্ডওয়্যার নলেজ থাকলেই এই সমস্যার সমাধান সম্ভব।
আজকের লেখায় আমি একদম প্র্যাকটিক্যাল কিছু সলিউশন নিয়ে কথা বলবো যা আমি ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার করি। কোনো তাত্ত্বিক কথা নয়, সোজা অ্যাকশনে যাবো। চলুন দেখে নেওয়া যাক, উইন্ডোজ রান করার সময় হ্যাং হলে করণীয় কী।
১. প্রথমেই অপ্রয়োজনীয় স্টার্টআপ প্রোগ্রাম বন্ধ করুন
পিসি অন করার সাথে সাথেই যদি দেখেন উইন্ডোজ লোড হতে বা কাজ শুরু করতে ৫-১০ মিনিট সময় নিচ্ছে, তবে বুঝবেন ব্যাকগ্রাউন্ডে প্রচুর অ্যাপ চালু হচ্ছে। আমরা যখন বিভিন্ন সফটওয়্যার ইনস্টল করি (যেমন—Skype, Spotify, বা বিভিন্ন অ্যান্টিভাইরাস), সেগুলো ডিফল্টভাবে পিসি স্টার্ট হওয়ার সাথে সাথেই চালু হয়ে যায়। এগুলো আপনার র্যামের একটা বড় অংশ দখল করে রাখে।
সমাধান করবেন যেভাবে:
- কিবোর্ডে Ctrl + Shift + Esc একসাথে চাপুন। টাস্ক ম্যানেজার ওপেন হবে।
- সেখান থেকে Startup ট্যাবে যান।
- লিস্টে দেখুন কোন কোন অ্যাপ ‘Enabled’ করা আছে। যেগুলোর দরকার নেই (যেমন—গেম লঞ্চার, পিডিএফ রিডার), সেগুলোতে রাইট ক্লিক করে Disable করে দিন।
বিশ্বাস করুন, শুধু এই একটা কাজ করলেই আপনার পিসির বুট টাইম অর্ধেক কমে যাবে।
২. সি ড্রাইভ (C Drive) লাল হয়ে নেই তো?
উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম যে ড্রাইভে ইনস্টল করা থাকে (সাধারণত C Drive), সেখানে যদি পর্যাপ্ত খালি জায়গা না থাকে, তাহলে পিসি হ্যাং করবেই। উইন্ডোজের কাজ করার জন্য কিছু “Temp” স্পেস বা শ্বাস নেওয়ার জায়গার দরকার হয়। আমি অনেককে দেখেছি ৫০০ জিবির হার্ডডিস্কের পুরোটাই মুভি আর গানে ভর্তি করে রাখেন, সি ড্রাইভে লাল দাগ উঠে থাকে। এটা পিসির জন্য আত্মঘাতী।
চেষ্টা করবেন সি ড্রাইভে অন্তত ২০-৩০ জিবি খালি জায়গা রাখতে। যদি সম্ভব হয়, ডেস্কটপে বা ডকুমেন্টস ফোল্ডারে ভারী ফাইল রাখবেন না। কারণ এগুলো টেকনিক্যালি সি ড্রাইভেরই অংশ।
৩. টেম্পোরারি ফাইল বা আবর্জনা পরিষ্কার করুন
আমরা ব্রাউজারে যা দেখি বা পিসিতে যা কাজ করি, তার একটা ক্যাশ (Cache) ফাইল তৈরি হয়। এগুলো জমতে জমতে পিসিকে স্লো করে দেয়। এগুলো পরিষ্কার করলে আপনার কোনো ব্যক্তিগত ডাটা ডিলিট হবে না, শুধু আবর্জনা যাবে।
ক্লিন করার নিয়ম:
১. কিবোর্ডে Windows key + R চাপুন। Run কমান্ড আসবে। ২. লিখুন %temp% এবং Enter দিন। ৩. ফোল্ডারে যা কিছু আছে, সব সিলেক্ট (Ctrl + A) করে ডিলিট করে দিন। কিছু ফাইল ডিলিট হতে চাইবে না, সেগুলো স্কিপ (Skip) করুন। ৪. একইভাবে Run কমান্ডে temp এবং prefetch লিখে সার্চ দিয়ে সেখানকার ফাইলগুলোও ডিলিট করুন।
সপ্তাহে অন্তত একবার এই কাজটি করলে পিসি নতুনের মতো স্মুথ থাকবে।
৪. হার্ডডিস্ক (HDD) নাকি এসএসডি (SSD)?
এটা এখন আর অপশন নয়, এটা এখন প্রয়োজনীয়তা। আপনি যদি এখনো উইন্ডোজ ১০ বা ১১ চালানোর জন্য মান্ধাতা আমলের মেকানিক্যাল হার্ডডিস্ক (HDD) ব্যবহার করেন, তবে হ্যাং হওয়া নিয়ে অভিযোগ করার অধিকার আপনার নেই। সিরিয়াসলি।
হার্ডডিস্কের রিড/রাইট স্পিড উইন্ডোজের বর্তমান ভার্সনগুলোর ডিমান্ড মেটাতে পারে না। ফলে আপনি যখনই কোনো ফোল্ডার ওপেন করতে যান, ডিস্ক ইউসেজ (Disk Usage) ১০০% হয়ে যায় এবং পিসি জমে যায়।
আমার পরামর্শ: অন্তত ১২০ জিবির বা ২৪০ জিবির একটা SATA বা NVMe SSD লাগিয়ে নিন এবং সেখানে উইন্ডোজ ইনস্টল করুন। পিসি চালু হতে ১০ সেকেন্ডও লাগবে না, আর “হ্যাং” শব্দটা আপনি ভুলে যাবেন। এটা গ্যারান্টি। মাত্র ২-৩ হাজার টাকা খরচ করে পিসির পারফরম্যান্স ১০ গুণ বাড়ানো সম্ভব।
৫. র্যাম (RAM) কি পর্যাপ্ত?
আজকের দিনে ৪ জিবি র্যাম দিয়ে উইন্ডোজ ১০ চালানো আর সাইকেল দিয়ে রেসিং ট্র্যাকে নামা একই কথা। গুগল ক্রোমে ৩-৪টা ট্যাব ওপেন করলেই ৪ জিবি র্যাম শেষ হয়ে যায়। পিসি হ্যাং হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো র্যামের অভাব।
ভালো পারফরম্যান্সের জন্য অন্তত ৮ জিবি র্যাম ব্যবহার করুন। আর যদি ভিডিও এডিটিং বা ভারী কাজ করেন, তবে ১৬ জিবি মাস্ট। যদি নতুন র্যাম লাগানোর বাজেট না থাকে, তবে ভার্চুয়াল মেমোরি (Virtual Memory) বাড়িয়ে দেখতে পারেন, তবে সেটা হার্ডওয়্যার আপগ্রেডের মতো কাজ করবে না।
৬. ম্যালওয়্যার বা ভাইরাস স্ক্যান
অনেক সময় পিসির কনফিগারেশন ভালো হওয়ার পরেও হ্যাং করে। এর পেছনের কালপ্রিট হতে পারে ম্যালওয়্যার। বিশেষ করে ক্র্যাক সফটওয়্যার বা পাইরেটেড গেম যারা ব্যবহার করেন, তাদের পিসিতে বিটকয়েন মাইনার ভাইরাস ঢুকে থাকার সম্ভাবনা প্রবল। এই ভাইরাসগুলো ব্যাকগ্রাউন্ডে আপনার প্রসেসর ব্যবহার করে মাইনিং করতে থাকে, ফলে আপনি মাউস নাড়ানোর শক্তিও পান না।
উইন্ডোজের ডিফল্ট Windows Security (আগের নাম Windows Defender) এখন যথেষ্ট শক্তিশালী। একবার ‘Full Scan’ দিয়ে দেখুন। কোনো থার্ড-পার্টি অ্যান্টিভাইরাস (যেমন—Avast বা Norton) ব্যবহার না করাই ভালো, কারণ এগুলো নিজেই পিসিকে স্লো করে দেয়।
৭. উইন্ডোজ এবং ড্রাইভার আপডেট
অনেকেই ডাটা বাঁচানোর জন্য উইন্ডোজ আপডেট বন্ধ করে রাখেন। এটা একটা ভুল ধারণা। মাইক্রোসফট নিয়মিত বাগ (Bug) ফিক্স করে আপডেটের মাধ্যমে। আপনার গ্রাফিক্স ড্রাইভার বা চিপসেট ড্রাইভার যদি আউটডেটেড হয়, তবে স্ক্রিন ফ্রিজ হয়ে যেতে পারে।
- Settings > Update & Security তে গিয়ে চেক করুন কোনো আপডেট পেন্ডিং আছে কি না।
- Device Manager এ গিয়ে ডিসপ্লে ড্রাইভার আপডেট করে নিন।
তবে হ্যাঁ, মাঝে মাঝে উইন্ডোজের নতুন আপডেটে বাগ থাকে। তাই আপডেট আসার সাথে সাথেই না দিয়ে, এক সপ্তাহ অপেক্ষা করে রিভিউ দেখে আপডেট দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
৮. ব্যাকগ্রাউন্ড অ্যাপস বন্ধ করুন
উইন্ডোজ ১১-তে প্রচুর অদরকারী অ্যাপ ব্যাকগ্রাউন্ডে চলতে থাকে। যেমন—Cortana, Xbox Game Bar (যদি গেম না খেলেন), Feedback Hub ইত্যাদি।
Settings > Privacy > Background apps -এ গিয়ে অপ্রয়োজনীয় অ্যাপগুলোর পারমিশন বন্ধ করে দিন। এতে প্রসেসরের ওপর চাপ কমবে।
৯. কমান্ড প্রম্পট (CMD) দিয়ে সিস্টেম রিপেয়ার
মাঝে মাঝে উইন্ডোজের সিস্টেম ফাইল করাপ্ট হয়ে যায়, যার ফলে পিসি অকারণে হ্যাং করে। এর জন্য খুব চমৎকার একটি টুল আছে যা কমান্ড প্রম্পটের মাধ্যমে রান করা যায়।
- সার্চ বারে cmd লিখুন, রাইট ক্লিক করে Run as administrator দিন।
- কালো উইন্ডো আসলে লিখুন: sfc /scannow
- এন্টার দিন এবং অপেক্ষা করুন।
এই কমান্ডটি পুরো সিস্টেম স্ক্যান করে কোনো করাপ্টেড ফাইল পেলে তা অটোমেটিক রিপেয়ার করে দেবে। এটা অনেকটা ম্যাজিকের মতো কাজ করে।
১০. শেষ উপায়: রিসেট বা নতুন করে উইন্ডোজ দেওয়া
ওপরের কোনো পদ্ধতিই যদি কাজ না করে এবং আপনার মনে হয় সিস্টেমের ভেতরে বড় কোনো গণ্ডগোল আছে, তবে শেষ চিকিৎসা হলো “উইন্ডোজ সেটআপ”। তবে এখন আর পেনড্রাইভ দিয়ে বুট করে উইন্ডোজ দেওয়ার ঝামেলায় না গেলেও চলে।
Settings > Update & Security > Recovery অপশন থেকে Reset this PC দিলেই পিসি ফ্রেশ হয়ে যাবে। তবে অবশ্যই সি ড্রাইভের ব্যাকআপ নিয়ে নেবেন।
বোনাস টিপস: পিসি ঠান্ডা রাখুন
আমরা সফটওয়্যার নিয়ে এত কথা বলি যে হার্ডওয়্যারের ফিজিক্যাল কন্ডিশনের কথা ভুলেই যাই। আপনার প্রসেসরের ওপরের ফ্যানটি যদি ধুলোয় জ্যাম হয়ে থাকে বা থার্মাল পেস্ট শুকিয়ে যায়, তবে প্রসেসর গরম হয়ে যাবে। আর প্রসেসর যখন অতিরিক্ত গরম হয়, তখন সে নিজেকে বাঁচাতে পারফরম্যান্স কমিয়ে দেয় (Thermal Throttling)। ফলে পিসি হ্যাং করে।
অন্তত ৬ মাসে একবার পিসির কেসিং খুলে ব্লোয়ার দিয়ে ধুলো পরিষ্কার করুন। ল্যাপটপ হলে সার্ভিসিং সেন্টারে নিয়ে গিয়ে হিটসিঙ্ক পরিষ্কার করান।
শেষ কথা
কম্পিউটার হ্যাং হওয়াটা বিরক্তিকর, কিন্তু সমাধান অযোগ্য নয়। আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, শুধুমাত্র এসএসডি (SSD) লাগিয়ে এবং স্টার্টআপ প্রোগ্রামগুলো নিয়ন্ত্রণ করেই ৮০ শতাংশ সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। আপনার পিসিটি আপনার কাজের প্রধান হাতিয়ার, তাই এর সামান্য যত্ন নিন। দেখবেন এটি আপনাকে হতাশ করবে না।
আজই ওপরের টিপসগুলো অ্যাপ্লাই করুন আর পিসির স্পিড দেখে নিজেই অবাক হয়ে যান!
威樂
December 9, 2025 at 8:31 am
Great article — very helpful to see a simple checklist of common fixes when Windows keeps freezing.
威樂
December 9, 2025 at 8:34 am
Thanks for covering both software and hardware-side causes — sometimes freezing is about background apps, not just hardware issues.
威樂
December 9, 2025 at 8:36 am
The tip about updating drivers and checking for malware is really important — many freezing issues start from outdated or corrupted drivers.
威樂
December 9, 2025 at 8:38 am
I appreciate the suggestion to check system temperature — overheating can silently cause all sorts of performance issues.